কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান-
সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ দাবদাহের কবলে পড়েছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০–৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যা ইউরোপের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্কুল বন্ধ, ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন, বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি এবং দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলীয় বোর্দো শহরে তাপমাত্রা ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মধ্য ফ্রান্সে পোয়তিয়ে শহরে ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৪৭ সালের পর সর্বোচ্চ। দেশের কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। তীব্র গরমে হিট স্ট্রোক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতায় ফ্রান্সে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৫৪টি বিভাগে সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। প্রায় ২০০টি স্কুল বন্ধ বা ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে এবং আইফেল টাওয়ার বিকেল ৪টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। স্পেনের কর্ডোবা ও অন্যান্য অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তীব্র গরমের কারণে সেখানে ‘ক্লাইমেট রিফিউজ’ বা জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং দাবানলের ঝুঁকির কারণে ঐতিহ্যবাহী ‘সান জুয়ান’ উৎসবের আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং দেশটির তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালের জুনের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। ইতালির রোম, মিলান, বলোগনা ও ফ্লোরেন্সে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে এবং দেশটির ১২টি প্রধান শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতাসূচক রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। জার্মানিতেও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে সেখানে গরমজনিত কারণে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে বেলজিয়ামে প্রচণ্ড গরমে বহুতল ভবনের ছাদের তাপমাত্রা ৫০-৬০ ডিগ্রিতে পৌঁছানোয় বন্য পাখিরা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যাচ্ছে।
দাবদাহের প্রধান কারণ-
১. ‘হিট ডোম’ বা তাপগম্বুজের সৃষ্টি
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমান তাপপ্রবাহের প্রধান কারণ হলো “হিট ডোম” বা তাপগম্বুজ। বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় তৈরি হলে তা গরম বাতাসকে আটকে রাখে। ফলে মেঘ সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয় এবং সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পড়ে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
২. সাহারা মরুভূমি থেকে উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ
উত্তর আফ্রিকার সাহারা অঞ্চল থেকে অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এই বায়ুপ্রবাহ তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করছে।
৩. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইউরোপে ঘন ঘন ও তীব্র তাপপ্রবাহ এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সুস্পষ্ট লক্ষণ। ভবিষ্যতে এ ধরনের দাবদাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক হতে পারে।
৪. ওমেগা ব্লক আবহাওয়া প্যাটার্ন
বর্তমান তাপপ্রবাহের পেছনে “ওমেগা ব্লক” নামক বিশেষ আবহাওয়া বিন্যাসও ভূমিকা রাখছে। এই অবস্থায় গরম বায়ু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আটকে থাকে এবং কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।
দাবদাহের প্রভাব
জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
• তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফ্রান্সে গরম থেকে বাঁচতে নদী ও হ্রদে নামার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানি ও ইতালিতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি
• দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে বনভূমিতে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পানির উৎসগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর চাপ
• এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, রেলপথ বিকৃতি এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
করণীয়
ব্যক্তিগত পর্যায়ে-
• রোদের সরাসরি প্রভাব থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে রক্ষা করতে হবে।
• বেশি বেশি পানি পান করতে হবে । প্রতিদিন একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের ২.৫ থেকে ৩ লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
• ঢিলেঢালা ও সুতি কাপড় পরিধানের ব্যবস্থা নিন।
• সম্ভব হলে দিনে দুইবার গোসল করুন।
• বাসস্থানে যথাসম্ভব আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
• দূরপাল্লার ভ্রমণ কিংবা আউটডোর কর্ম্মকাণ্ড সীমিত রাখুন।
• যথাসম্ভব ইনডোর / শীতল স্থানে খেলাধুলার ও শরীর চর্চার ব্যবস্থা করুন।
• তরল পানীয় যথাঃ ডাবের পানি, আখের রস, বেলের শরবত, পুদিনাপাতা এবং লেবুর রস এ গরমে দারুণ কার্যকর।
• তরমুজ, আনারস, শসা, বাঙ্গী, লিচু, জামরুল ইত্যাদি খাবেন।
• খাবার তালিকায় চিড়া, দই ও কলা রাখতে পারেন। তা শরীরকে ঠান্ডা রাখবে ও পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করবে।
• লাউ, পটল, শসা, চিচিঙ্গা, গাজর, পেঁপে, পালংশাক, টমেটো- এসব সব্জি পানি শূন্যতা দূর করতে দারুন সহায়ক।
• অতিরিক্ত তেল মশলাদার খাবার রাখবেন না। ভাজা পোড়া খাবার যথাঃ পুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন।
• গরু/ খাসির মাংস, ডিম, ঘি, মাখন, কোমল পানীয়, চকলেট, মিষ্টি ইত্যাদি উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার খাওয়া সীমিত করুন।
• শরীরে পানি শূন্যতা তৈরি করে এমন পানিয় যেমনঃ চা, কফি্ ও এলকোহল পরিহার করুন ।
• খোলা জায়গার বিক্রিত খাবার, পানি, শরবত, আখের রস ইত্যাদিতে দ্রুত রোগ জীবাণু ছড়ায়। এসব পরিহার করতে হবে।
• এ সময় অতিরিক্ত হাঁটা, ব্যায়াম, পরিশ্রম ও অধিক পরিমানে খাদ্য গ্রহণ পরিহার করুন।
• শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
• গাড়ির ভেতরে কোনো অবস্থাতেই শিশু বা বৃদ্ধকে একা রাখা যাবে না।
• হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে-
• স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ‘কুলিং সেন্টার’ বা শীতল আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা।
• হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলোকে প্রস্তুত রাখা।
• জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালানো।
• নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
দীর্ঘমেয়াদি করণীয়-
• গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো।
• নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি।
• নগর এলাকায় সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণ সম্প্রসারণ।
• জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা।
• জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।
ফ্রান্সসহ ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবদাহ শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের একটি সতর্কবার্তা। তাপগম্বুজ, সাহারার উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে ইউরোপ আজ অভূতপূর্ব তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)
জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবারিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল