দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের কথা উঠলেই জাপানের নাম আসে। দেশটিতে শত বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
সম্প্রতি জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার। দি ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।
জাপানে এত বেশি মানুষ দীর্ঘ জীবন পাচ্ছেন—এর পেছনে কি বিশেষ কোনো খাবার বা খাদ্যাভ্যাস কাজ করছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাবারকে দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
জিনগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলেই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য নিশ্চিত হয়। তবে খাদ্যাভ্যাস অবশ্যই এর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
জাপানিদের খাবারে কী বিশেষত্ব?
ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাদ্যাভ্যাসে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, মাছ, সয়া-জাতীয় খাবার, ভাত ও গাঁজানো খাবার থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই খাবারের পরিমাণও তুলনামূলক পরিমিত রাখা হয়।
তবে এর সুফল পেতে ভারতীয় বা বাংলাদেশিদের জাপানি খাবার হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং তাদের খাদ্যাভ্যাসের মূল নীতিগুলো নিজেদের পরিচিত খাবারের মধ্যেই কাজে লাগানো যায়।
অর্থাৎ বেশি করে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবার রাখা, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোই মূল বিষয়।
আমাদের খাবারেও আছে অনেক উপকারী উপাদান
দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত খাবারেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অনেক উপাদান রয়েছে। ডাল, রাজমা, ছোলা, মুগ বা অন্যান্য অঙ্কুরিত শস্য, শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, মিলেট, বাদাম, বীজ, দই ও বিভিন্ন গাঁজানো খাবার থেকে পাওয়া যায় আঁশ, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ।
যারা প্রাণিজ খাবার খান, তারা ডিম, মাছ ও চর্বি কম এমন মাংস থেকেও প্রয়োজনীয় প্রোটিন পেতে পারেন।
আধুনিক জীবনযাত্রায় খাবারের ধরনও বদলেছে। পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এসব খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে প্রতিদিনের খাবারের মূল অংশ যেন এগুলো না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানোর পাশাপাশি আঁশসমৃদ্ধ খাবার ও পর্যাপ্ত প্রোটিন বাড়ানো যেতে পারে। একটি সাধারণ খাবারের প্লেটে শাকসবজি, প্রোটিন, আঁশসমৃদ্ধ শর্করা এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
যেমন—সবজি দিয়ে ডাল ও রুটি, রাজমার সঙ্গে লালচাল ও সালাদ কিংবা সবজির সঙ্গে দই—এসব খাবার দিয়েই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। এর জন্য আলাদা কোনো দামি ‘দীর্ঘায়ুর ডায়েট’ অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।
বয়স বাড়লে প্রোটিনের গুরুত্ব বাড়ে
শুধু দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়, বয়স বাড়ার পরও সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ এবং নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডিম, মাছ, মুরগি, দই, পনির, সয়া, ডাল ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে। পর্যাপ্ত প্রোটিন শরীরের পেশি ধরে রাখতে সহায়তা করে, যা বয়স বাড়ার পর শক্তি, চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজে স্বনির্ভরতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
লবণ কমাতে স্বাদে ভরসা করুন মসলা-হার্বসে
খাবারে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার না করেও স্বাদ বাড়ানো যায়। ধনে, জিরা, আদা, রসুন, হলুদ ও মরিচের মতো পরিচিত মসলা ব্যবহার করে খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে শাকসবজি, মূলজাতীয় খাবার ও অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ উপাদান নিয়মিত খাবারে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে। পরিশোধিত শস্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে মাঝেমধ্যে লালচাল, গোটা শস্য, মিলেট বা অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ শর্করা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
শুধু খাবার নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, পর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই জাপানের শতবর্ষীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট খাবার নয়। বরং নিয়মিত, পরিমিত ও বৈচিত্র্যময় খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্য শুধু কত বছর বাঁচা নয়। বরং যতদিন বাঁচা যায়, ততদিন যেন সক্রিয়, সুস্থ ও স্বনির্ভর থাকা যায়। পরিচিত খাবারের মধ্যেই কম প্রক্রিয়াজাত খাবার, বেশি শাকসবজি, পর্যাপ্ত প্রোটিন, পরিমিত খাবার এবং সক্রিয় জীবনযাপন এই অভ্যাসগুলোই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের ভিত্তি হতে পারে।