আহমেদ সোহেল বাপ্পী-
আজ মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারসংলগ্ন গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি স্বাধীনতার এই সামরিক স্থপতিকে, যাঁর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনি শুধু একটি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেননি, বরং একটি নবজাত রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁর সামরিক দক্ষতা, সংগঠনের ক্ষমতা এবং শৃঙ্খলাবোধ মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখলেও বাঙালি হওয়ার কারণে প্রাপ্য মূল্যায়ন পাননি বলে মনে করতেন। ১৯৪২ সালে মেজর পদে উন্নীত হওয়ার পরও তাঁকে কর্নেল হিসেবে অবসর নিতে হয়। এই জাতিগত বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনা দৃঢ় করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে অবতীর্ণ হন। মার্চে যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিরোধ ছিল বিক্ষিপ্ত। এপ্রিল মাসে মুজিবনগর সরকার তাঁকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ঘোষণা করলে মুক্তিবাহিনী একটি বৈধ ও সংগঠিত রূপ পায়।
তাঁর রণকৌশল ছিল বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী। গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে ক্ষয়িষ্ণু করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়মিত বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণ—এই দ্বৈত কৌশল মুক্তিযুদ্ধকে কার্যকর করে তোলে। তাঁর নেতৃত্বে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। হাজার হাজার তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে সংগঠিতভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন ও যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত হেনে পাকিস্তানি সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল করার পরিকল্পনা ছিল তাঁরই। এমনকি কিলো ফ্লাইট গঠনের মাধ্যমে বিমান শক্তির সূচনাও তাঁর সময়েই হয়। তিনি শুধু বিজয়ের পথ দেখাননি, বিজয়ের ভিত্তিও নির্মাণ করেছিলেন।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাঁর মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারত এবং সমন্বয়ের অভাবে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি সুসংগঠিত সামরিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ফলে তাঁর অবদান শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বাধীনতার পরও তিনি নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি। শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করলেও একদলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তনের সময় তিনি সংসদ সদস্যপদ ও দলীয় সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে বড় মনে করাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। এই আপোষহীন অবস্থানের কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার হন। পরে জাতীয় জনতা পার্টি গঠন করে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও দলীয় মেরুকরণের বাস্তবতায় তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে তিনি আজও গভীর শ্রদ্ধার নাম। সুনামগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই বীর সিলেটেই চিরনিদ্রায় শায়িত। তাঁর নামে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় গর্বের প্রতীক। তবে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর অবদানকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরা জরুরি। ১৯৮৫ সালে তিনি মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন, কিন্তু শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গবেষণা, পাঠ্যক্রম এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নে তাঁর নেতৃত্বের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করা।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—জাতীয় বীরদের মূল্যায়ন দলীয় আনুগত্যের মানদণ্ডে নয়, ইতিহাসের সত্য ও অবদানের ভিত্তিতে। বঙ্গবীর জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর জীবন আমাদের শেখায়, শৃঙ্খলা, সাহস ও আদর্শ একসঙ্গে থাকলে একটি জাতি তার স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
বিশ্লেষক: মানবাধিকার কর্মী
লেখক, গবেষক ও পর্যবেক্ষক
(সীমান্তহীন গণতন্ত্র)