1. ph.jayed@gmail.com : akothadesk42 :
  2. admin@amaderkatha24.com : kamader42 :
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:০৩ অপরাহ্ন

তদারকি না হস্তক্ষেপ: এমপিদের সক্রিয়তা, সাংবিধানিক সীমারেখা ও দলের সুনাম

আমাদের কথা ডেস্ক
  • আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

আহমেদ সোহেল (বাপ্পী) প্যারিস

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাম্প্রতিক তৎপরতা জনমনে আলোচনার ঝড় তুলেছে। কোথাও হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কোথাও বাজারে চাঁদাবাজি রোধে সরব হওয়া, আবার কোথাও নিজ দলের অভিযুক্ত কর্মীদের পুলিশে সোপর্দ করা—এসব উদ্যোগে সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাচ্ছেন।

সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসাও মিলছে। কিন্তু এর সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে: সংবিধান ও আইন অনুযায়ী একজন এমপি কি এসব কাজ করতে পারেন? আর এসব পদক্ষেপে ক্ষমতাসীন দলের সুনাম বাড়ছে, নাকি অজান্তেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে?

বাংলাদেশ–এর রাষ্ট্রকাঠামো ক্ষমতার বিভাজনের নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের সংবিধান–এর ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়েছে। ৫৫(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ হবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে। অর্থাৎ এমপিরা জনগণের প্রতিনিধি ও আইনপ্রণেতা; প্রশাসন পরিচালনা, দাপ্তরিক নির্দেশ দেওয়া বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া তাদের সরাসরি দায়িত্ব নয়—যদি না তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হন।

এমপিরা অবশ্যই তদারকি করতে পারেন। জনগণের অভিযোগ শুনতে পারেন, অনিয়ম তুলে ধরতে পারেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশ পাঠাতে পারেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, প্রশ্নোত্তর, আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন তদারকি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে রূপ নেয়, বা দলীয় লোকবহর নিয়ে দপ্তরে গিয়ে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।

সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও শৃঙ্খলা নির্ধারিত হয়েছে Government Servants (Conduct) Rules, 1979–এ। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা পরিচালিত হয় Police Act, 1861 অনুযায়ী। কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়া পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। একজন এমপি অভিযোগ জানাতে পারেন, তথ্য দিতে পারেন, কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না।

তবু প্রশ্ন থাকে—মানুষ কেন এসব উদ্যোগে সন্তুষ্ট? কারণ দীর্ঘদিনের সেবাগত দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতিতে মানুষ দ্রুত ফল দেখতে চায়। একজন জনপ্রতিনিধি সরাসরি গিয়ে ব্যবস্থা নিলে তা দৃশ্যমান হয়। কিন্তু এই দৃশ্যমানতা কি স্থায়ী সমাধান দেয়? নাকি ব্যক্তি-নির্ভর উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে?

এখানেই ক্ষমতাসীন দলের সুনাম ও দুর্নামের বিষয়টি জড়িয়ে যায়। দলীয় কর্মী হলেও অপরাধে ছাড় না দেওয়া ইতিবাচক বার্তা দেয়। এতে কঠোরতা ও নৈতিক অবস্থানের প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। কিন্তু যদি একই সঙ্গে দলীয় লোকবহর নিয়ে প্রশাসনে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই সুনামই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ধারণা জন্ম নিলে জনআস্থা নষ্ট হয়।

সুনাম ধরে রাখতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রথমত, এমপিদের তদারকি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। সংসদীয় কমিটিকে শক্তিশালী করা, লিখিত সুপারিশ ও প্রকাশ্য প্রতিবেদন তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। দ্বিতীয়ত, দলীয়ভাবে একটি আচরণবিধি নির্ধারণ করা যেতে পারে—তদারকির পদ্ধতি কী হবে, কোথায় সীমা টানা হবে। তৃতীয়ত, সেবা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ও কর্মদক্ষতার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে ব্যক্তি-নির্ভর অভিযানের প্রয়োজন কমে যায়। চতুর্থত, আইন প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করতে হবে—দলীয় বা বিরোধী, সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড।
গণতন্ত্রে স্থায়ী সুনাম আসে নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহি থেকে, তাৎক্ষণিক প্রদর্শন থেকে নয়। ব্যক্তি উদ্যোগে সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সেই পরিবর্তন টেকে না। সংবিধান যে ভারসাম্য নির্ধারণ করেছে, তা মান্য করেই জনসেবা উন্নয়ন সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সদিচ্ছার নয়, পদ্ধতির। ক্ষমতাসীন দলের সামনে এখন সুযোগ আছে—দেখানোর যে তারা কেবল দৃশ্যমান কঠোরতায় নয়, কাঠামোগত সংস্কারেও বিশ্বাসী। সেই পথই দলকে দীর্ঘস্থায়ী সুনাম দেবে, আর রাষ্ট্রকে দেবে শক্ত ভিত্তি।

বিশ্লেষক:আহমেদ সোহেল (বাপ্পী)
মানবাধিকার কর্মী
লেখক, গবেষক ও পর্যবেক্ষক
(সীমান্তহীন গণতন্ত্র)

নিউজটি শেয়ার করুন

এই জাতীয় আরো খবর
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Maintained By Macrosys