সুরাইয়া নাজনীন

অপরাধবোধ নাকি অভাববোধ! নারী মুক্তির অন্য পিঠের নামই কি এটা। কে জš§ দিল? কেউ বলছে সমাজ, কেউ বলছে পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা আবার কেউ বলছে নারী নিজেই। পুরুষশাসিত এই সমাজে নারীর জন্য রয়েছে শৃঙ্খলার আলাদা আইন। নারীর মধ্যে অপরাধবোধ কি বেশি? মতামত দিয়েছেন অনেকেই, আবার ভিন্নধর্মী গল্পের মধ্যেও উঠে এসেছে এর সার্বিক চিত্র-
কলিংবেল টিপে দাঁড়িয়ে আছে দোলা। দরজা খুলল শাশুড়ি। অফিস করে ফিরলেও শাশুড়ির চোহারা দেখে মনে হলো সে বুঝি সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। ব্যাগ রাখতেই ঘরের কাজের তালিকা চোখের সামনে ঘুরঘুর করতে লাগল দোলার। ওদিক থেকে শুরু হলো ডাকাডাকি। আজ কি রান্না করলে বাবুতো খেতেই পারল না, বাড়ির কারো দিকে কি তোমার খেয়াল আছে? তখন দোলা ভেবে নিল, ঠিকইতো সারাদিন অফিস করে বাড়ির কারো দিকে ঠিকঠাক খেয়াল নেয়া হয় না! কিন্তু সবার খেয়াল নেয়ার দায়ীত্ব কি শুধু দোলার?
গতকাল বুধবার সকালে বেশ মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে শোভন। ঘোর কাটাল রানু। এই শুনছ বাবুর একটা দোলনা হলে ভালো হতো না? এবারোতো হলো মেয়ে ওর আবার দোলনা কিসের, মেয়ে মানুষ কষ্ট করে বড় হোক। নিজে রোজগার করলে বুঝতে টাকার মর্ম। মুখটা চুপসে গেল রানুর কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এর জন্য কি রানুই দায়ী। অজানা শত প্রশ্ন জমা হতে থাকল রানুর মনে।
সিগন্যাল পড়তেই হুটোপাটি করে বাসে উঠতে গেল নীরা। মা হাসপাতালে সময়ের মধ্যে যেতেই হবে। হেলপার দরজা থেকেই বলতে শুরু করে দিল আপা ওঠা যাবে না অনেক ভিড় পরেরটাই ওঠেন। সময় নেই নীরার হাতে। হেলপারকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালো। এইতো শুরু হলো পুরুষতান্ত্রিকতা। কেন উঠলেন এই ভিড়ের বাসে, একটু পরেই তো বলবেন এখানে হাত দিলেন কেন, এটা করলেন কেন? সরে দাঁড়ান আরো কত কি। নীরা প্রায় কেঁদেই দিল? আর ভাবলো আমরা কোথায় বাস করি যেখানে আমাদের অবস্থান ঠিক এমন আর ১৫ বছর আগেও বুঝি এমনই ছিল।
কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘অপরাধবোধ আসলে সচেতনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটা পুরুষ কিংবা নারী উভয়েরই থাকতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে সচেতনতা কমে বা বাড়ে না তবে শিক্ষা মানুষকে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করে। যে মন বেশি সচেতন সে মনেই অপরাধবোধ বেশি জš§ নেয়। তবে আমার মনে হয় শুধু অপরাধবোধ নয় আমাদের সমাজ একজন নারীকে আফসোসের জায়গাটিও তৈরি করে দেয়। একজন নারী অনেক সময় নিজেই নিজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়। কিন্তু সার্বিকভাবে দেখলে নারীর আসলে কোনো দোষ থাকে না তার জন্য পারিপাশ্বিকতা অনেকাংশে দায়ী। আমাদের সমাজের মায়েরা নিজেই নিজেকে হেয় মনে করে। জীবনধারা সুতা দিয়ে বেঁধে ফেলে, এটাও একটা ভ্রান্ত অপরাধবোধ যা কেবলই কৃত্রিম।’
অপরাধবোধের উৎস অনুভূতিপ্রবণতা এবং দায়ীত্ববোধ। সমাজব্যবস্থার আপাত পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের মধ্যে অপরাধবোধ বেশি এটা ঠিক। যেহেতু মেয়েদের চরিত্রে ওই দুটি উপাদান ছেলেদের তুলনায় বেশি। তার মানে কিন্তু এটা নয়, মেয়েরা ওই দুটো বেশি নিয়েই জš§ায়। আসলে ছোটবেলা থেকে মেয়েদের সংসারমুখী করে তোলা হয়। দায়িত্ববোধ তারই বেশি এটা বোঝানো হয়। কিন্তু ছেলেরা এর উল্টো ব্যাখা নিয়ে বড় হয়। এসব ভাবনা মেয়েদের রক্তে মিশে যায়। তাই পরিবারে কোনো প্রতিকূল অবস্থা তৈরি হলে নারীরাই অপরাধবোধে বেশি ভোগে।
প্রকৃতি ও নগর সৌন্দর্যবিদ রাফেয়া আবেদীন তার ব্যপ্তি থেকে এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন, ‘অপরাধের বিষয়টি সমাজের নীতি-নৈতিকতা, আইন, সংস্কৃতি ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয়। আমাদের সমাজে যা অপরাধ, অন্য সমাজে সেটাই হয়ত স্বাভাবিক। ঠিক একইভাবে নারীর জন্য যা অপরাধ, পুরুষের জন্য সেটা স্বাভাবিক। এটা একটা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। তবে নারী যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার নির্মাণ, কাজেই নারীর অপরাধ বা পুরুষের অপরাধের মানদণ্ড নির্ধারিত হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা। যেমন, আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিদিনই নারীরা, সেটা ৩ বছরের কন্যাশিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত, বাছ-বিচারহীনভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে দ্বায়ী করা হচ্ছে নারীকে। নারীর পোশাক, তার দরিদ্র, কেন সে রাতে একা একা জš§দিনের পার্টিতে যাবে ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কিন্তু ‘যে পুরুষ ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে তার বিষয়ে সমাজ এসব প্রশ্ন তুলছে না, তুললেও শেষপর্যন্ত নারীকেই দোষী মনে করে। এটা একটা মানসিক ট্রমা। নারী এসব পরিস্থিতিতে একটা মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে থাকে। এ কারণে নারীও অনেক সময় নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে।’
নাকি নারীরা আসলেও অপরাধ করে? এ বিষয়ে তিনি জানান, সব মানুষের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রের আইন মানুষের এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের আইন পর্যন্ত সবই পিতৃতন্ত্রের শিকার, নারীকে যেখানে কেবল পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে সেখানে এই সমাজ নারীকেই বেশি অপরাধী হিসেবে দেখবে। এবং দেখছেও তাই। আর আগেই বলেছি, নারী দীর্ঘদিন ধরে নির্মিত হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের দ্বারা। যে কারণে দেখবেন পুরুষের শেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনেও নারীকে দেখা যায়। পুরুষ নারীকে তৈরি করেছে- নারী হবে নরম, কোমল, স্নিগ্ধ, মমতাময়ী, হসোজ্জ্বল, সংসারী, গৃহনিপুণা ইত্যাদি। আমাদের সাহিত্য, সিনেমা লক্ষ করলেই দেখবেন নারীর সৌন্দর্যের কত বিচিত্র রূপ। পুরুষ নারীকে যেভাবে পেতে চায় সেভাবেই নির্মাণ করে। এর ব্যতিক্রম হলে তারা নারীকেই দায়ী করে।’
এর জন্য প্রধানত দায়ী কারা? এ প্রশ্নে তিনি বলেছেন, ‘বলতে পারেন, এটার জন্য কি কেবল পুরুষই দায়ী? তা মোটেও নয়। পুরুষ দায়ী না। দায়ী পুরুষতন্ত্র। যেটা কেবল পুরুষ নয় নারীও ধারণ করতে পারে। তাছাড়া নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারে পিছনে যে পুঁজির বিকাশের একটা বড় সম্পর্ক আছে, সেটাও ভাবতে হবে। কারণ পুঁজির কাছে নারীর প্রতিটি অঙ্গই হচ্ছে পণ্য। এক্ষেত্রে নারীও অনেক সময় নিজেকে পণ্য করে তুলছে। কিন্তু সেটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা সঠিক নয়। কারণ এদের সংখ্যা কত? খুবই সামান্য, যারা গড্ডালিকায় ভেসে চলেছে। আর যারা সচেতনভাবে বা জীবনের নানা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্রোতের বিপরীতে লড়াই করছে পৃথিবীতে তাদের সংখ্যাই বেশি।’
মানসিক এই দায়বদ্ধতা থেকে কি বের হওয়া সম্ভব? তিনি বললেন, ‘আমি মনে করি, অবশ্যই সম্ভব। তবে সেটা একটা সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা, অর্থনৈতিক জোগান, প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, মানুষের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা করতে হবে। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য নারীবাদীদের তত্ত্ব আমাদের সমাজে কতটুকু গ্রহণ করা যায় সেটাও ভাবতে হবে। যেটুকু আমাদের সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটুকু গ্রহণ করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি যেটা সেটা হলো, বাইরের তত্ত্ব নয়, প্রয়োজন শিশুদের মধ্যে নারী-পুরুষের বিভেদ না করা, তাদের উদার, অসাম্প্রদায়িক, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে বড় করা। কারণ শিশুরাই একদিন নেতৃত্ব দেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের। সে জন্য পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভেতর সবাইকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা-চর্চা করা প্রয়োজন। তাহলে একদিন নারীও সবার সঙ্গে সমাজের সামগ্রিক কাজে অংশ নিতে পারবে। নারীর অপরাধ বেশি কি না এটা কেউ ভাববে না। নারীও তার মানসিক দায়বব্ধতা বা ট্রমা থেকে মুক্ত হতে পারবে।

You Might Also Like

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).