মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণমানুষের যুদ্ধ। মহান এই মুক্তিযুদ্ধে কেবল পুরুষ নয়, পুরুষের পাশাপাশি নারীও ছিল সক্রিয়। অজানা-অচেনা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রুষা করেছেন বহু নারী নিজের শ্রম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। অনাহারি, অর্ধাহারি ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কখনো মমতাময়ী মায়ের মতো, কখনো বা স্নেহময়ী বোনের মতো-

নারীর এই সক্রিয়তা কখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনো বা যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে থেকে। যেভাবেই হোক এ মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তাদের বিশ্বাস ছিল অবিচল, সাহস ছিল কঠিন। তারামন বিবির মতো বহু মুক্তিযোদ্ধা আছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাও অসংখ্য। অজানা-অচেনা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রুষা করেছেন বহু নারী নিজের শ্রম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। অনাহারি, অর্ধাহারি ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কখনো মমতাময়ী মায়ের মতো, কখনো বা স্নেহময়ী বোনের মতো। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার রান্না করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চরম দুঃসময়ে পাকিস্তানি হানাদারের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখানেও ছিল নারীর মমতাময়ী আঁচল। পুরুষের পাশাপাশি সেদিনের নারীর বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, আন্তরিকতা এবং সাহসের ফল এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন অনেক নারী। যেমন: কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরা। তাদের মতো অনেক নারী সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, পাকিস্তানি সৈন্যদের খতম করেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও গোবরা ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক নারী।
কলকাতার পার্ক সার্কাস ও পদ্মপুকুরের মাঝামাঝি গোবরা নামের স্থানে শুধু মহিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করেন। সেটি ‘গোবরা ক্যাম্প’ নামেই প্রচলিত ছিল। ওই ক্যাম্পটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। জানা যায়, নারী যোদ্ধাদের জন্য অনুরূপ আরো তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে। ‘গোবরা ক্যাম্পে’ মেয়েদের দেয়া হতো তিন রকম ট্রেনিং। ১. সিভিল ডিফেন্স, ২. নার্সিং, ৩. অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ। সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষক ছিলেন শিপ্রা সরকার ও সেবা চৌধুরী। নার্সিং শেখাতেন ডা. মীরালাল ও ডা. দেবী ঘোষ। অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ কৌশল শেখাতেন ক্যাপ্টেন এস এম তারেক ও মেজর জয়দীপ সিং।’
ভারতে শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসংখ্য নারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সেবা করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। কবি, লেখক, সাংবাদিক এবং শিল্পী এরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে। তাদের লেখায় এবং শিল্পীদের গানেও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধেও প্রেরণা। শুধু তাই নয়, পথে-প্রান্তরে অলিগলিতে গান গেয়ে তারা অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং সেই অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহায়তার জন্য ব্যয় করেছেন। এরা ছিলেন যুদ্ধেও প্রেরণা। আবার দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, শান্তিকমিটি, রাজাকার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এদেশের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে, বন্দরে অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। জুগিয়েছেন খাদ্য, অস্ত্র বহন করেছেন, লুকিয়ে রেখেছেন, গোপন সংবাদ আনা নেয়া করেছেন। যেমন: কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বেবী মওদুদ। এছাড়াও হাজার হাজার নাম না জানা নারী আছেন যারা নিজের সব স্বার্থ ত্যাগ করে, সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে দেশমাতার জন্য নিজের সন্তান কখনো বা স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধাদের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের আশি শতাংশ নারী হয়তো এই শ্রেণীতে পড়েন। অথচ এই নারীরা তাদের অবদানের স্বীকৃতি পাননি আজো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এদেশের প্রায় তিন লাখ নারী। তারা ধর্ষিত হয়েছেন, নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা সহ্য করেও প্রাণে বেঁচে গেছেন। এরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও নৈতিকভাবে পরাজিত হননি। এরা আপস করেননি পাকিস্তানিদের সঙ্গে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এরা স্বামী, পুত্র, ভাইকে ধরিয়ে দেননি শত্রুর হাতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন অনেক নারী।

You Might Also Like

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).